Tuesday , June 18 2019
Home / অন্যান্য / তাহের বললেন, জিয়া আমার হাঁটুর নিচে থাকবে

তাহের বললেন, জিয়া আমার হাঁটুর নিচে থাকবে

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে বর্বরোচিত হত্যাকা- ঘটেছিল ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে। সেনাবাহিনীর একটি খুনি চক্র বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর খ্যাত আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মোশতাক আহমদকে নিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল। সেই হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে অবৈধ ক্ষমতায় এসেছিলেন ঘাতকচক্রের প্রহরায় খন্দকার মোশতাক আহমদ। মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের অনেক নেতা। অন্যদিকে জাতীয় চার নেতাসহ দলের নেতা-কর্মীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন, কারাবরণ ও দেশত্যাগের ঘটনা ঘটেছিল। তিন বাহিনীর প্রধান অসাংবিধানিক সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন। জেনারেল শফিউল্লাহকে বিদায় করে জেনারেল জিয়াকে সেনাপ্রধান করা হয়েছিল। গোটা দেশ শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে স্তম্ভিত হয়েছিল। মার্শাল ল আর কারফিউ একটি ভুতুড়ে জনপদে দেশকে পরিণত করেছিল। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশের বাইরে থাকায় জীবিত ছিলেন। জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে ৩ নভেম্বর পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে খুনি মোশতাককে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করা হয়েছিল। জেনারেল জিয়াকে বন্দী করে খালেদ মোশাররফ সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তার অভ্যুত্থানের সময়ে মোশতাকের নির্দেশে বঙ্গবন্ধুর খুনিরা জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করে খালেদ মোশাররফের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দেশত্যাগের সুযোগ পায়। সেসব ঘটনা সবার জানা। ৭ নভেম্বর জাসদ, গণবাহিনী ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার শক্তিতে কর্নেল তাহের বীরউত্তম আরেকটি অভ্যুত্থান ঘটিয়ে জেনারেল জিয়াউর রহমানকে বন্দীদশা থেকে মুক্ত করেন। সেই অভ্যুত্থানে মুক্তিযুদ্ধের বীরউত্তম খালেদ মোশাররফকে তার সহযোগী বীরদের সঙ্গে হত্যা করা হয়। শেষ মুহূর্তে বিচারপতি সায়েমকে রাষ্ট্রপতি করা হলেও ক্ষমতার মসনদে আবির্ভূত হন সেনাশাসক জিয়াউর রহমান। একসময় সায়েমকে বন্দুকের জোরে পদত্যাগ করিয়ে নিজেই প্রেসিডেন্ট, সেনাপ্রধান ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হয়ে যান। সেই ইতিহাস সবার জানা।

মুজিববাহিনীর অন্যতম প্রধান, রাজনীতির রহস্যপুরুষ ও জাসদের স্রষ্টা সিরাজুল আলম খানের জবানবন্দিতে লেখা ‘আমি সিরাজুল আলম খান’ বইয়ে উঠে এসেছে সেই ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান ও তাদের লক্ষ্য অর্জনের ব্যর্থতার ইতিহাস।

সিরাজুল আলম খান বলেছেন, ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে পরিচালিত আমাদের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য ছিল ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত সেনা অভ্যুত্থান ও সামরিক বাহিনীতে তার একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার প্রতিক্রিয়ায় যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল, সেই সুযোগকে কাজে লাগানো। কর্নেল তাহেরের ওপর এ অভ্যুত্থানের নীলনকশা প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য ৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় জাসদের ‘সিওসি’ বৈঠক বসে। সেখানে তাহের তার পুরো পরিকল্পনা তুলে ধরেন। এ সময় জিয়াউর রহমানের অবস্থান কী, এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেছিলেন ‘সে আমার হাঁটুতে পড়ে থাকবে।’ এরপর আমি পরিকল্পনা অনুযায়ী অভ্যুত্থান ঘটানোর সিদ্ধান্ত নিতে পরামর্শ দিলে কমিটি তা সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করে। সভা শেষে বিদায়ের সময় তাহেরকে বললাম, কোনো অবস্থায় যেন এটি ব্যর্থ অভ্যুত্থানে পরিণত না হয়। তিনি বললেন, ‘রাত ১টায় এটি ঘটবে।’

অভ্যুত্থানের পর শাহবাগের বেতার কেন্দ্র থেকে প্রথম যে কথাটি ঘোষণা করা হলো তা ছিল ‘বাংলাদেশের বীর বিপ্লবী জনগণ, “বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা” ও “বিপ্লবী গণবাহিনী”র নেতৃত্বে “সিপাহি জনতার বিপ্লব” সংঘটিত হয়েছে। রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা হয়েছে। জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করা হয়েছে।’ টেলিফোনে আমার নির্দেশমতো শামসুদ্দিন পেয়ারা ঘোষণাটি লিখে স্বকণ্ঠে তা বেতারে প্রচার করে।

এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেশের কয়েকটি জেলায় পুলিশ, আনসার ও বিডিআর সদস্যরা গণবাহিনীর নেতৃত্বে সংগঠিত হয়। কয়েক ঘণ্টা বিলম্ব হলেও ঢাকা শহরে ছাত্রদের এবং ঢাকার আশপাশে সৈনিকদের মিছিল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দিকে আসতে থাকে। সিওসি হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত ছিল জিয়াউর রহমান ও কর্নেল তাহেরের সঙ্গে বিপ্লবী সৈনিকরা শহীদ মিনারে এসে ছাত্র, শ্রমিকদের সঙ্গে মিলিত হবে। সেখানে কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল গঠিত হবে। সৈনিকদের ১২ দফা মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে এবং ‘জাতীয় সরকার গঠিত হবে’। কিন্তু এ সময় খন্দকার মোশতাক আহমদের সমর্থক একদল আমলা ও সেনা কর্মকর্তা এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ান। জিয়াউর রহমানও সেই বাধার বিরুদ্ধে কিছু করতে না পেরে তাদের সহযোগিতা করলেন।

৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের সেনাপ্রধানের পদ গ্রহণ করার বিষয়টি বেশির ভাগ অফিসার ও সাধারণ সৈনিকের মনঃপূত ছিল না। জিয়াউর রহমানকে বন্দী করার ঘটনাও তারা মেনে নিতে পারলেন না। এতে সেনাবাহিনীতে এক অনিশ্চিত অবস্থার সৃষ্টি হয়। রাষ্ট্রক্ষমতায় কেবল বিশৃঙ্খলাই নয়, এটাই আমাদের ক্ষমতা গ্রহণের উপযুক্ত সময়। নভেম্বরের সেই কয়দিন ঢাকা শহরে এবং শ্রমিক এলাকাগুলোয় ছাত্র, যুব ও শ্রমিকরা গণআন্দোলনের স্রোত সৃষ্টি করে। ৪ নভেম্বর আমি কর্নেল তাহের ও ড. আখলাকুর রহমান তার লালমাটিয়ার বাসায় মিলিত হই। এই প্রথমবারের মতো বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সৈনিকদের সংগঠিত অবস্থার কথা তাদের দুজনকে জানাই। ’৭৪-এর ১৭ মার্চ জলিল, রব গ্রেফতারের পর এই সংস্থার কাজ সমন্বয়হীন হয়ে পড়ে। মেজর জলিল এ দায়িত্ব পালন করতেন। ক্যান্টনমেন্টে তাদের নিজস্ব একটি কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল ছিল।

আমরা তিনজন মিলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি দেশের যে অনিশ্চয়তা ও ক্ষমতা বলয়ে যে শূন্যতা তা থেকে রক্ষা করতে বাইরের ছাত্র, যুবক, শ্রমিক এবং ভিতরের সৈনিক সংস্থার যোগসাজশে একটি বিপ্লবী অভ্যুত্থান ঘটানো অনিবার্য হয়ে পড়েছে। ড. আখলাক ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে যোগাযোগের লিঙ্ক প্রতিষ্ঠা ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সহায়তার কথা তুললে, কর্নেল তাহের বললেন ‘আমি সেটা খুঁজে বের করব।’ কর্নেল তাহের সেই যোগাযোগ করতে সক্ষম হলেন। প্রশ্ন উঠল- কে এই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে থাকবেন? তখনকার পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই জিয়াউর রহমানের নাম আসে। এ ব্যাপারেও কর্নেল তাহের বললেন, আমি সে ব্যাপারটাও সামলাতে পারব।

নভেম্বরের ৪, ৫, ৬ তারিখ অভ্যুত্থানের আয়োজন ও প্রস্তুতিতে চলে গেল। এর মধ্যেই সৈনিক সংস্থার মাধ্যমে তাহেরের কাছে জিয়া বার্তা পাঠালেন- ‘তাহের আমাকে মুক্ত কর, আমাকে বাঁচাও।’ তাহের এসব ঘটনা রিপোর্ট করে বিপ্লব ঘটানো যে সম্ভব তা বললেন। ৬ নভেম্বর রাত ১টায় অভ্যুত্থানের সময় নির্ধারণ করা হয়। ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই ক্যান্টনমেন্টের বাইরে ছাত্র-শ্রমিকদের মিছিল, সমাবেশ ইত্যাদি ঘটিয়ে সেনা বিদ্রোহের সঙ্গে তাকে একাকার করে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে ঘড়ির কাঁটা অনুযায়ী সংযোগ স্থাপনের এ শক্তিসমূহ প্রচ  ব্যর্থতার পরিচয় দেয়।

সিদ্ধান্ত হয়েছিল ৭ নভেম্বর ভোর ৬টার দিকে জিয়া ও তাহেরের নেতৃত্বে ক্যান্টনমেন্ট থেকে সামরিক অফিসার ও সৈনিকরা ট্যাঙ্ক, সাঁজোয়া যান ও অন্যান্য সামরিক বাহন নিয়ে শহীদ মিনারে আসবেন। একই সময় ছাত্র-যুবক-শ্রমিকরা সেখানে উপস্থিত হবে। ছাত্ররা আসবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নগরীর বিভিন্ন কলেজ থেকে। শ্রমিকরা আসবে আদমজী, তেজগাঁও ও পোস্তগোলা থেকে মিছিল করে। ওখানে বিপ্লবী কমান্ড কাউন্সিল গঠন ও ঘোষণা করা হবে। পরবর্তী ধাপে তার অধীনে সব ‘রাজনৈতিক দল, শ্রমিক ও ছাত্র-যুবকদের’ নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করা হবে। ক্যান্টনমেন্টের ব্যারাকগুলোয় বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ছাড়া আরও কিছু গোষ্ঠী অতিদ্রুত সক্রিয় হয়ে উঠল। বাইরে মাহবুবুল আলম চাষীসহ একদল আমলাও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের মাধ্যমে ঘটনাকে ভিন্ন খাতে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। সিরাজুল আলম খানের ভাষায়, কার্যত তারাই জিয়াকে তাদের পক্ষে নিয়ে যেতে সক্ষম হন। আর ক্যান্টনমেন্টের বাইরের চিত্র হলো, সময়মতো ছাত্র-যুবক-শ্রমিকরা শহীদ মিনারে সমবেত হয়ে ক্যান্টনমেন্টের দিকে তাদের এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করতে পারল না। এদের সংগঠিত করার জন্য নির্দিষ্ট করে যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তারাও তা কার্যকর করতে পারেনি। দলের প্রধান নেতারা সে সময় জেলে ছিলেন। তাদের অনুপস্থিতিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তাদের যোগ্যতা প্রমাণে চরমভাবে ব্যর্থ হন। পরবর্তী সময়েও এ ব্যর্থতাকে অতিক্রম করার সুযোগ না নিয়ে একটি অসময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে সবকিছু একপর্যায়ে আমাদের হাতের বাইরে চলে যায়।

সিরাজুল আলম খানের বর্ণনায়, এই ঘটনার পর জাসদের একটি অংশ তাদের না জানিয়ে যে হঠকারী আরেক দফা ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা নিয়েছিল তার পরিণতিতেই যে কর্নেল তাহের বীরউত্তমের সেনাশাসক জিয়ার হাতে ফাঁসিতে ঝুলতে হলো তার আভাস পাওয়া যায়। সিরাজুল আলম খান বলেছেন, ৯ নভেম্বর ’৭৫ সালে মেজর জলিল ও আ স ম রব কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করেন। এ সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণে তারা আলোচনায় বসেন। আলোচনার গতি দেখে তিনি বুঝতে পারলেন দুটি মতে স্পষ্ট দুটি ভাগ অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে। একাংশের মত দু-চার দিনের মধ্যেই ৭ নভেম্বরের মতো আরেকটি অভ্যুত্থান ঘটানো। আরেক অংশের মত জিয়াকে ক্ষমতা সংহত করার সুযোগ দিয়ে আরও সংগঠিতভাবে অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা করা। এ অবস্থায় আমি একটি ছোট্ট ‘অ্যাকশন কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব দিলাম। অবস্থা বুঝে এই কমিটি জাসদ ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার হাইকমান্ডের কাছে রিপোর্ট করবে। তখন বাস্তবতার নিরিখে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

সিরাজুল আলম খান বলেছেন, নভেম্বরের ১৫ কি ১৬ তারিখ এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২৩ নভেম্বর আমার কাছে খবর এলো কোনো একটি সূত্র থেকে- মেজর জলিল, রব ও তাহেরকে গ্রেফতার করা হবে। ওইদিনই এস এম হলের হাউস টিউটরের বাসা থেকে তাদের প্রথমে ও পরে ইনুকে গ্রেফতার করা হলো। আমি বিস্মিত হলাম। গ্রেফতার হওয়ার মতো কোনো ঘটনা বা সিদ্ধান্ত তো হয়নি। এ ঘটনার ৩০ বছর পর ২০০৫ সালে শরীফ নুরুল আম্বিয়ার কাছ থেকে জানতে পারি আমার অনুপস্থিতিতে, আমাকে না জানিয়ে বা আমার মতামত না নিয়ে মাত্র কয়েকজন মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কয়েকদিনের মধ্যে আবারও ক্যান্টনমেন্টে অভ্যুত্থান ঘটানো হবে। সেই প্রস্তাব ছিল মেজর জলিল ও কর্নেল তাহেরের। বলা বাহুল্য, জিয়াউর রহমানকে ক্ষমতাচ্যুত করতেই এ অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্ট করা হয়েছিল। ক্ষুদ্র অ্যাকশন কমিটিতে ছিলেন জলিল, রব, তাহের ও ইনু। আর আমার প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় শরীফ নুরুল আম্বিয়াকে।

কর্নেল তাহের সম্পর্কে সিরাজুল আলম খান বলেছেন, তাকে আমি অত্যন্ত সাহসী এবং দেশপ্রেমিক মানুষ হিসেবে দেখেছি। তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে নামি কমান্ডো ছিলেন। জনগণের জন্য তার গভীর দরদ ও আবেগময় ভালোবাসা ছিল। আমাদের আলোচনায় সব সময় তিনি তার সামরিক প্রশিক্ষণকে কীভাবে জনগণের স্বার্থে ব্যবহার করা যায় তার উপায় বের করার ওপর গুরুত্ব দিতেন। তার অনুপ্রেরণায়ই তার সব ভাইবোন সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। একটি পরিবারের সবার এমন অংশগ্রহণের নজির খুব কম। আর এ দেশে সূর্যসেনের পর কর্নেল তাহেরই প্রথম ব্যক্তি যার রাজনৈতিক কারণে ফাঁসি হয়েছে। ৭ নভেম্বর অভ্যুত্থান লক্ষ্যচ্যুত হওয়ার পর পুনরায় আরেকটি অভ্যুত্থান ঘটানোর অবিবেচনাপ্রসূত ও অপ্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে জাসদ, গণবাহিনী ও শ্রমিক লীগ নেতৃবৃন্দ গ্রেফতার হন। এ ধরনের একটি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন যে তখন একেবারেই অসম্ভব ছিল তা নেতাদের পক্ষে বোঝাও সম্ভব নয়। জিয়াউর রহমানের নির্যাতন এরপর সংগঠন হিসেবে জাসদকে প্রায় অস্তিত্বহীনতার পথে নিয়ে যায়। গোপন আদালতের বিচারে কর্নেল তাহেরকে প্রাণদ  এবং বাকি সবাইকে আজীবন কিংবা দীর্ঘমেয়াদি দ  দেওয়া হয়। ২১ জুলাই ’৭৬ কর্নেল তাহেরের মৃত্যুদ  ফাঁসিতে কার্যকর হয়। সিরাজুল আলম খান নিজেও সে সময় ২৬ নভেম্বর গ্রেফতার হয়েছিলেন। দীর্ঘ পাঁচ বছর কারাবাসের পর ’৮১ সালের ১ মে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। আ স ম রব অসুস্থ থাকায় চিকিৎসার জন্য জার্মানিতে ছিলেন। তাকেও সেখান থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।

আমি সিরাজুল আলম খান তার জবানবন্দিতে বলেছেন, এখানে তার জীবনের যে পর্বটি তুলে ধরা হয়েছে তা কেবল একটি অংশ মাত্র। এটি তার জীবনের প্রথম ভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও আত্মজীবনী নয়। কখনো যদি তার জীবন নিয়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী লেখা হয় তবে তা হবে একটি অতিপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সাহিত্য। ’৮১ সালে মুক্তিলাভের পর তিনি বুঝতে পারেন গোটা দেশটাই জেলখানায় পরিণত হয়েছে। অন্যরা জেল থেকে মুক্ত হয়ে ভিন্ন জীবন বেছে নেয়। সংসার জীবন শুরু করে। জীবিকার সন্ধানে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। দু-চার জন অবশ্য রাজনীতিকেই তাদের মূল জীবন করে তোলে। এরশাদের সামরিক শাসন বহাল থাকার সময় তিনি আর রাজনীতিতে অ্যাকটিভিস্ট হয়ে থাকলেন না। তার ভাষায় ‘পাঁচ বছরের জেলজীবন আমার চিন্তাজগতে মৌলিক পরিবর্তন আনে, তা আমার রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনে সহায়ক হয়। সে সময়ে জেলখানায় আমি প্রতিদিন গড়ে ১৫-১৬ ঘণ্টা পড়াশোনা করতাম। একজন ‘অ্যাকটিভিস্ট’ কীভাবে বুদ্ধিবৃত্তিচর্চার মধ্য দিয়ে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক সত্তায় পরিণত হয়, আমি তার এক দৃষ্টান্ত। ’৮৫ সালে ড. জিল্লুর রহমান খানের সঙ্গে আকস্মিক যোগাযোগ আমাকে নতুন রাজনীতির মানুষ হিসেবে আবির্ভূত হতে সাহায্য করে। সেই সময় থেকে তিনি ও আমি একযোগে কাজ করতে থাকি। এর ফলে গত ৩০-৩৫ বছরে বাংলাদেশের রাজনীতির জগতে নতুন চিন্তার ক্ষেত্র তৈরি হয়। সে বিষয়গুলো প্রকাশিত হয়নি।-শেষ

আমরা আগেই বলেছিলাম, সিরাজুল আলম খানের ইতিহাসের অনেক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে প্রবীণ রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ ভিন্নমত পোষণ করেছেন। সিরাজুল আলম খানের সকল বক্তব্যের জবাব দেবেন ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের নায়ক তোফায়েল আহমেদ।

About RASEL RASEL

Check Also

সোহেল তাজের অভিযোগের তীর র‌্যাবের দিকে

অপহৃত হওয়ার এক সপ্তাহের বেশি সময় পার হলেও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমেদ সোহেল তাজের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *